ফারায়েয কি? কাদের জন্য জানা জরুরী? মুসলিম উত্তরাধিকার আইন

বেশিরভাগ মানুষেই জানে না ফারায়েজ কি? অথচ সবার জন্য ফারায়েয কি? তা জানা অত্যান্ত জরুরী একটি বিষয়; ফারায়েয না জানার কারণে সমাজে ঝগড়া বিবাদ বেড়েই চলছে; ইসলামে জীবন বিধান জ্ঞানের অর্ধেকই হচ্ছে ফারায়েজ, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন

পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলিমরাই পন্ডিত জাতী কিন্তু আজকের দুনিয়ায় মুসলিমরা জ্ঞানহীন জাতীতে পরিণত হয়েছে। তাদের মৌলিক জ্ঞান ফারায়েয বেমালুম ভুলে গিয়েছে। ফলে অনেক পরিবারে যুগ যুগ ধরে মামলা-মোকাদ্দামা চলছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, যুবকদের হৃদয়ে ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি হতে চলেছে। অনেক যুবক নিজেকে এখন ইসলামীকরণ করতে শুরু করছে। ইসলামী জ্ঞান বিকাশের লড়াইও শুরু করেছে অনেকে। তাদের উদ্দেশ্যেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

 

আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে ফারায়েয কি? ফারায়েজ এর গুরুত্ব ও ফজিলত কি? ফরায়েয শাস্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কি? ফারায়েজ শাস্ত্রের বন্টন পদ্ধতি কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকলে মুসলিম পরিবারে ঝগরা বিবাদ কমে যেত; বিশেষ করে সম্পদ বন্টন নিয়ে কোন ঝামেলা হত না।

ফারায়েয কি?

ফরায়েয (فَرَائِضُ) শব্দটি হচ্ছে আরবি فَرِيْضَةٌ এর বহুবচন। শাব্দিক অর্থ হলো- ফরয করা হয়েছে এমন বিষয়, আবশ্যকীয় বিষয়, অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিষয়। ইসলামী পরিভাষায় فَرَائِض বলা হয়, মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে। আর যে বণ্টন পদ্ধতির আলোকে উত্তারাধিকার সম্পত্তি বণ্টন করা হয় তাকে শরীয়তের পরিভাষায় عِلْمُ الْفَرَائِض বলা হয়।

আল্লামা আইনি রহ. বলেন, উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে ইসলামে فَرَائِض নামে নামকরণ করার কারণ হচ্ছে, শরীয়তে উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টন নীতি আল্লাহ তা’লা বিশেষভাবে ফরয করেছেন এবং প্রত্যকের অংশ কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং এর মাঝে কমবেশি করার কোন সুযোগ নেই। তাই উত্তরাধিকার সম্পত্তিকে শরীয়তে فَرَائِض বলা হয়।

মুসলিমদের উত্তরাধিকার সম্পত্তির বন্টন পদ্ধতিকে পরিভাষায় ফারায়েয শাস্ত্র হিসাবে জ্ঞানীদের কাছে বিবেচিত।

ফারায়েয এর গুরুত্ব ফযীলত

ইসলামী শরীয়তে উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টন পদ্ধতিকে পরিভাষায় عِلْمُ الْفَرَائِض বা ফারায়েয শাস্ত্র বলা হয়। শরীয়তে عِلْمُ الْفَرَائِض হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। এ কারণেই عِلْمُ الْفَرَائِض নিজে শেখা এবং অন্যকে শেখানোর গুরুত্ব এবং ফযীলতও রয়েছে অত্যান্ত ব্যাপক। নিম্নে عِلْمُ الْفَرَائِض এর গুরুত্ব এবং ফযীলত সংক্রান্ত কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল:

হাসিদ নং ১

ইবনে মাজাহ এবং ইমাম দারে ক্বুতনী রহ. হযরত আবু হুরায়রা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে,

عن أبى هريرة رضـ أنَّ النبي صلى الله عليه و سلم قال: تَعَلَّمُوا الْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوهَ النَّاسَ فَإِنَّهُ نِصْفُ الْعِلْمِ وَهُوَ أَوَّلُ شَيْءٍ يُنْسَى وَهُوَ أَوَّلُ شَيْءٍ يُنْتَزَعُ مِنْ أُمَّتِي.

অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. ইরশাদ করেছন, তোমরা নিজের عِلْمُ الْفَرَائِض শেখো এবং লোকদেরকেও শেখাও। কারণ তা জ্ঞানের অর্ধেক। আর এই জ্ঞানকেই সর্বপ্রথম বিস্মৃত করে দেয়া হবে এবং একেই সর্বপ্রথম (মানুষের মন থেকে) উঠিয়ে নেয়া হবে।

হাসিদ নং ২

ইমাম তিরমিযি, ইমাম নাসাঈ, ইমাম আহমাদ, ইমাম হাকিম রহ. সহ অনেকেই ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেন যে,

عن ابن مسعودٍ رضـ عن النبي صلى الله عليه و سلم قال: تَعَلَّمُوا الْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوهَا النَّاسَ فَإِنِّي امْرُؤٌ مَقْبُوضٌ ، وَإِنَّ الْعِلْمَ سَيُقْبَضُ و تَظْهَرُ الفِتَنُ حَتَّى يَخْتَلِفَ الِاثْنَانِ فِي الْفَرِيضَةِ لَا يَجِدَانِ مَنْ يَقْضِيْهَا.

অর্থ: রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, তোমরা নিজের عِلْمُ الْفَرَائِض শেখো এবং লোকদেরকেও শেখাও। কারণ আমাকে অচিরেই উঠিয়ে নেয়া হবে। আর একসময় ইলমকেও উঠিয়ে নেয়া হবে এবং বিভিন্ন ফেতনার আত্মপ্রকাশ ঘটবে। তখন দুই ব্যক্তি তাদের উত্তরাধিকার সম্পদ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হবে কিন্তু তারা এ বিষয়ে শরয়ী সমাধান দেয়ার মত লোক খোঁজে পাবে না।

হাসিদ নং ৩

 ইমাম ত্ববরানী রহ. আবু বাকরাহ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে,

مَا رَوَاهُ أبو بَكْرَةَ مَرْفُوعًا: تَعَلَّمُوا الْقُرْآنَ وَالْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوهَا النَّاسَ ، أَوْشَكَ أَنْ يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَخْتَصِمُ الرَّجُلَانِ فِي الْفَرِيضَةِ فَلَا يَجِدَانِ مَنْ يَفْصِلُ بَيْنَهُمَا.

অর্থ: রাসূল সা. ইরশাদ করেছন, তোমরা কোরআন এবং عِلْمُ الْفَرَائِض নিজে শিখ এবং লোকদেরকে শেখাও। অদূর ভবিষ্যতে লোকদের কাছে এমন এক সময় আসবে যখন দুই ব্যক্তি তাদের উত্তরাধিকার সম্পদ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হবে কিন্তু তারা এ বিষয়ে শরয়ী সমাধান দেয়ার মত লোক খোঁজে পাবে না।

উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে জানা যায় সমাজ জীবনে এর গুরুত্ব কতটা আবশ্যক । এই জ্ঞান এখন মানুষের মন থেকে উঠিয়ে গেছে । ফলে সম্পদ বন্টনে সমাজে অসাধু দেওয়ানী সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি মুসলিম নারী পুরুষের জন্য জ্ঞান শিক্ষা করা ফরজ কিন্তু সেই মহান বাণীটি তারা ভুলে গেছে।

ফরায়েয শাস্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

প্রতিটি ধর্ম এবং সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টন পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল বিষয়। তাই ইসলামী শরীয়তে উত্তারাধিকার সম্পত্তির বণ্টন পদ্ধতির বিষয়টি অত্যান্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হয়েছে।

আত্মীয়দের মাঝে এই সম্পত্তি কিভাবে বণ্টন হবে এবং কার অংশ কতটুকু হবে তার মৌলিক আলোচনা আল্লাহ তা’লা স্বয়ং কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন এবং রাসূল সা. প্রতিটি বিষয়ে বিশদ বিবরণ হাদীসে উল্লেখ করেছেন। ফলে ইসলামী শরীয়তে عِلْمُ الْفَرَائِض বা উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন পদ্ধতি পৃথিবীর অন্য সকল ধর্ম এবং মতবাদের বণ্টন পদ্ধতি থেকে সবদিক থেকে মানুষের জন্য উপযোগী এবং সমতাভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি পদ্ধতি।

নিচে ইসলামী শরীয়তের উত্তরাধিকার সম্পদের বণ্টন পদ্ধতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হল:

  • ১ম বৈশিষ্ট্য: মৃত ব্যক্তির সকল সম্পদই উত্তরাধিকার সম্পত্তি।
  • ২য় বৈশিষ্ট্য: উত্তরাধিকার সম্পদ শুধুমাত্র আত্মীয়দের মাঝে বণ্টিত হবে; অনাত্মীয়দের মাঝে নয়।
  • ৩য় বৈশিষ্ট্য: উত্তরাধিকার সম্পদে নারীপুরুষ, বড়ছোট সকলের অংশই নির্ধারিত।
  • ৪র্থ বৈশিষ্ট্য: উত্তরাধিকার সম্পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের মাপকাঠি হল নিকটাত্মীয়তা; বয়সে বড় হওয়া নয়।
  • ৫ম বৈশিষ্ট্য: উত্তরাধিকার সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে বণ্টন করা; শরীকানাধীন কোন সম্পদ না রাখা।

উপরোক্ত বৈশিষ্টগুলোর বিস্তারিত নিচে দেওয়া করা হলো।

মৃত ব্যক্তির সকল সম্পদই উত্তরাধিকার সম্পত্তি।

ইসলামী উত্তরাধিকা বণ্টন পদ্ধতির প্রথম এবং অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: মৃত ব্যক্তি যত ধরনের সম্পদ রেখে গিয়েছে সকল সম্পদই ইসলামী শরীয়তে মিরাসের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। চাই সেটা মৃত ব্যক্তি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র হোক; যেমন: মৃতের ব্যবহারে পোশাক-আশাক ইত্যাদি, অথবা লাভজনক কোন ব্যবসায়িক সম্পদ হোক; যেমন: জমি, বাড়ি, বাগান, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি। ইসলামী শরীয়তে এই ধরনের সকল সম্পদই উত্তরাধিকা সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

কিন্তু ইসলামের পূর্ব থেকেই এমন অনেক ধর্ম এবং মতবাদ আছে যেখানে মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিগত জিনিসপত্রকে মিরাসের সম্পদ হিসেবে গণ্য করে না। তারা এগুলোকে হয়ত কবরের সাথে দাফন করে দেয় কিংবা স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়। ফলে এতে অনেক সময় ওয়ারিশরা বিপুল পরিমাণ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়।

উত্তরাধিকার সম্পদ শুধুমাত্র আত্মীয়দের মাঝে বণ্টিত হবে; অনাত্মীয়দের মাঝে নয়।

ইসলামী উত্তরাধিকা বণ্টন পদ্ধতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: শরীয়তে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে শুধুমাত্র আত্মীয়দের অংশ আছে এবং আত্মীয়রা যতক্ষণ জীবিত আছে ততক্ষণ অনাত্মীয় কোন ব্যক্তি মৃতের যতই কাছের হোক তাদের জন্য উত্তরাধিকার সম্পদে কোন অংশ থাকবে না। কিন্তু অনেক ধর্ম এবং মতবাদ এমন আছে যারা মৃতের প্রতিবেশী এবং ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধবের জন্যও মিরাসের সম্পদের একটি অংশ নির্ধারণ করে থাকে। ফলে প্রকৃত হকদার অনেক আত্মীয়-স্বজন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

উত্তরাধিকার সম্পদে নারীপুরুষ, বড়ছোট সকলের অংশই নির্ধারিত।

ইসলামী উত্তরাধিকা বণ্টন পদ্ধতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল: শরীয়তে নারী-পুরুষ, বড়-ছোট সকলের জন্যই তাদের অংশ অনুপাতে উত্তরাধিকার সম্পদ নির্ধারণ করেছে। তাই শরীয়তে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে কিংবা ছোট হওয়ার কারণে তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা কিংবা তাদেরকে কম দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

কিন্তু ইসলামের আগমনের পূর্বে জাহেলী সমাজে নারী এবং ছোট সন্তানের জন্য উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কোন অংশ ছিল না। তাদেরকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হত।

উত্তরাধিকার সম্পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের মাপকাঠি হল নিকটাত্মীয়তা; বয়সে বড় হওয়া নয়।

ইসলামী উত্তরাধিকা বণ্টন পদ্ধতির আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: শরীয়তে কে কতটুকু অংশ পাবে তার মাপকাঠি হল মৃতের নিকটাত্মীয়তা। অর্থাৎ যে মৃতব্যক্তির যতবেশি নিকটাত্মীয় হবে সে ততবেশী মিরাস পাবে। এক্ষেত্রে বয়সে বড়-ছোট হওয়ার মাঝে শরীয়ত কোন তারতম্য করে নি।

কিন্তু খৃষ্টধর্মের বণ্টন পদ্ধতিতে বড়-ছোটর মাঝে তারতম্য করা হয়ে থাকে। এতে অনেক সময় মৃতের দূরের আত্মীয়রা শুধুমাত্র বয়সে বড় হওয়ার কারণে বেশি পরিমাণ মিরাস পায় আর নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও বয়সে ছোট হওয়ার কারণে সম্পদ কম পায়।

উত্তরাধিকার সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে বণ্টন করা; শরীকানাধীন কোন সম্পদ না রাখা।

ইসলামী উত্তরাধিকা বণ্টন পদ্ধতির আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল: শরীয়তে মৃতের সকল সম্পদই ওয়ারিশেদর মাঝে সম্পূর্ণরূপে বণ্টন করে দেয়া হবে। কোন সম্পত্তিই শরিকানাধীন রাখা হবে না।

কিন্তু হিন্দু ধর্ম এবং প্রাচীন রোমক এবং গ্রীক সমাজে সকল সম্পত্তিকে সম্পূর্ণরূপে বণ্টন করা হত না। বরং জমি এবং বসবাসের বাড়ি ইত্যাদি সকলে ওয়ারিশদের মাঝে শরিকানাধীন রেখে দেয়া হত। ফলে পরবর্তীতে এগুলো নিয়ে বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদ, মামলা-মুকাদ্দামা ইত্যাদির সূচনা হত। তাই ইসলাম এই প্রথাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

এখনো অনেক পরিবারে শরীকানা সম্পতি দেখা যায় । ফলে এগুলো পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ, মামলা-মুকাদ্দামা চলতেই থাকে।

 

ফারায়েযের বণ্টনপদ্ধতি:

ইসলামে উত্তারাধিকার সম্পত্তি বন্টন-পদ্ধতি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। এ বন্টন পদ্ধতি সূরা নিসার তিনটি আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত তিনটি হচ্ছে-

সূরা নিসা, আয়াত নং- ১১ ও ১২

يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِىٓ أَوۡلَـٰدِڪُمۡ‌ۖ لِلذَّكَرِ مِثۡلُ حَظِّ ٱلۡأُنثَيَيۡنِ‌ۚ فَإِن كُنَّ نِسَآءً۬ فَوۡقَ ٱثۡنَتَيۡنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ‌ۖ وَإِن كَانَتۡ وَٲحِدَةً۬ فَلَهَا ٱلنِّصۡفُ‌ۚ وَلِأَبَوَيۡهِ لِكُلِّ وَٲحِدٍ۬ مِّنۡہُمَا ٱلسُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ ۥ وَلَدٌ۬‌ۚ فَإِن لَّمۡ يَكُن لَّهُ ۥ وَلَدٌ۬ وَوَرِثَهُ ۥۤ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ ٱلثُّلُثُ‌ۚ فَإِن كَانَ لَهُ ۥۤ إِخۡوَةٌ۬ فَلِأُمِّهِ ٱلسُّدُسُ‌ۚ مِنۢ بَعۡدِ وَصِيَّةٍ۬ يُوصِى بِہَآ أَوۡ دَيۡنٍ‌ۗ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُكُمۡ لَا تَدۡرُونَ أَيُّهُمۡ أَقۡرَبُ لَكُمۡ نَفۡعً۬ا‌ۚ فَرِيضَةً۬ مِّنَ ٱللَّهِ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمً۬ا (١١) ۞ وَلَڪُمۡ نِصۡفُ مَا تَرَكَ أَزۡوَٲجُڪُمۡ إِن لَّمۡ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ۬‌ۚ فَإِن ڪَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ۬ فَلَڪُمُ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَڪۡنَ‌ۚ مِنۢ بَعۡدِ وَصِيَّةٍ۬ يُوصِينَ بِهَآ أَوۡ دَيۡنٍ۬‌ۚ وَلَهُنَّ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَكۡتُمۡ إِن لَّمۡ يَڪُن لَّكُمۡ وَلَدٌ۬‌ۚ فَإِن ڪَانَ لَڪُمۡ وَلَدٌ۬ فَلَهُنَّ ٱلثُّمُنُ مِمَّا تَرَڪۡتُم‌ۚ مِّنۢ بَعۡدِ وَصِيَّةٍ۬ تُوصُونَ بِهَآ أَوۡ دَيۡنٍ۬‌ۗ وَإِن كَانَ رَجُلٌ۬ يُورَثُ ڪَلَـٰلَةً أَوِ ٱمۡرَأَةٌ۬ وَلَهُ ۥۤ أَخٌ أَوۡ أُخۡتٌ۬ فَلِكُلِّ وَٲحِدٍ۬ مِّنۡهُمَا ٱلسُّدُسُ‌ۚ فَإِن ڪَانُوٓاْ أَڪۡثَرَ مِن ذَٲلِكَ فَهُمۡ شُرَڪَآءُ فِى ٱلثُّلُثِ‌ۚ مِنۢ بَعۡدِ وَصِيَّةٍ۬ يُوصَىٰ بِہَآ أَوۡ دَيۡنٍ غَيۡرَ مُضَآرٍّ۬‌ۚ وَصِيَّةً۬ مِّنَ ٱللَّهِ‌ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ۬ (١٢)

অর্থঃ “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক। আর তার মাতা পিতা উভয়ের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ সে যা রেখে গেছে তা থেকে, যদি তার সন্তান থাকে। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিস হয় তার মাতা পিতা তখন তার মাতার জন্য তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। অসিয়ত পালনের পর, যা দ্বারা সে অসিয়ত করেছে অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের মাতা পিতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী তা তোমরা জান না। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীগণ যা রেখে গেছে তার অর্ধেক, যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে তা থেকে তোমাদের জন্য চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অসিয়ত করে গেছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর স্ত্রীদের জন্য তোমরা যা রেখে গিয়েছ তা থেকে চার ভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তাহলে তাদের জন্য আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে। তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি মা বাবা এবং সন্তান-সন্ততি নাই এমন কোন পুরুষ বা মহিলা মারা যায় এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের একভাগ। আর যদি তারা এর থেকে অধিক হয় তবে তারা সবাই তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে সমঅংশীদার হবে, যে অসিয়ত করা হয়েছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। কারো কোন ক্ষতি না করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অসিয়তস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।”

 

সূরা নিসা, আয়াত ন-  ১৭৬

سۡتَفۡتُونَكَ قُلِ ٱللَّهُ يُفۡتِيڪُمۡ فِى ٱلۡكَلَـٰلَةِ‌ۚ إِنِ ٱمۡرُؤٌاْ هَلَكَ لَيۡسَ لَهُ ۥ وَلَدٌ۬ وَلَهُ ۥۤ أُخۡتٌ۬ فَلَهَا نِصۡفُ مَا تَرَكَ‌ۚ وَهُوَ يَرِثُهَآ إِن لَّمۡ يَكُن لَّهَا وَلَدٌ۬‌ۚ فَإِن كَانَتَا ٱثۡنَتَيۡنِ فَلَهُمَا ٱلثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ‌ۚ وَإِن كَانُوٓاْ إِخۡوَةً۬ رِّجَالاً۬ وَنِسَآءً۬ فَلِلذَّكَرِ مِثۡلُ حَظِّ ٱلۡأُنثَيَيۡنِ‌ۗ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَڪُمۡ أَن تَضِلُّواْ‌ۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمُۢ (١٧٦)

অর্থঃ “তারা তোমার নিকট ব্যবস্থা প্রার্থনা করছে, তুমি বলঃ আল্লাহ তোমাদেরকে পিতা-পুত্রহীন সম্বন্ধে ব্যবস্থা দান করেছেন। যদি কোন ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় এবং তার ভগ্নী থাকে তাহলে সে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে অর্ধাংশ পাবে; এবং যদি কোন নারীর সন্তান না থাকে তাহলে তার ভাইই তদীয় উত্তরাধিকারী হবে; কিন্তু যদি দুই ভগ্নী থাকে তাহলে তাদের উভয়ের জন্য পরিত্যক্ত বিষয়ের দুই তৃতীয়াংশ এবং যদি তার ভাই ভগ্নী-পুরুষ ও নারীগণ থাকে তাহলে পুরুষ দুই নারীর তুল্য অংশ পাবে; আল্লাহ তোমাদের জন্য বর্ণনা করছেন যেন তোমরা বিভ্রান্ত না হও, এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।”

 

উপরোক্ত আয়াত থেকেই আমরা উত্তারাধিকার সম্পদ বন্টন-পদ্ধতির বিস্তারিত জেনে গেছি। এর আলোকেই এখন বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

মৃত ব্যাক্তির সম্পদ বন্টন করার আগে যা করতে হবে

মৃত ব্যাক্তির সম্পদ বন্টন করার আগে যা অবশ্যই করতে হবে তা হচ্ছে- উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে তার সকল দেনা পাওনা (স্ত্রীর মোহরসহ) পরিশোধ করতে হবে। মৃতের কাপন-দাপন এবং অন্যান্য কাজ কর্মের খরচ ও তার ইচ্ছে অনুযায়ী (উইল) এবং দান অনুযায়ী সম্পত্তি বাদ দিতে হবে। যদি তিনি এসব করে থাকেন। এগুলো করার পর যে সম্পত্তি থাকবে তা মিরাস অনুযায়ী ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন করা হবে।

উত্তরাধিকার ওয়ারিশদের প্রকারভেদ

ইসলামী শরীয়তে মৃত ব্যক্তির সকল ওয়ারিশদেরকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

১. أَصْحَابُ الفُرُوْض বা নির্ধারিত অংশের হকদার।

২. العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী।

৩. أوْلُوْ الأَرْحَام বা মৃতের অন্যান্য নিকটাত্মীয়।

নিচে ধারাবাহিকভাবে এই তিন শ্রেণী ওয়ারিশদের পরিচয় এবং তাদের মাঝে উত্তরাধিকার সম্মত্তি বণ্টনের প্রক্রিয়া উপস্থাপন করা হলো:

প্রথম শ্রেণি: أصحاب الفروض বা নির্ধারিত অংশের হকদার:

কুরআনে কারীমে যে সকল ওয়ারিশদের জন্য মিরাসের অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তাদেরকে أَصْحَابُ الفُرُوْض বলা হয়। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন, ঋণ পরিশোধ এবং ওসিয়ত পূরণের পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তা সর্বপ্রথম أَصْحَابُ الفُرُوْض এর মাঝে তাদের নির্দিষ্ট অংশ অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। এরপর যদি কোন সম্পদ অবশিষ্ট থাকে তাহলে পরবর্তী দু শ্রেণী পর্যায়ক্রমে পাবে।

أَصْحَابُ الفُرُوْض হল মোট ১২ জন। তন্মধ্যে ৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন মহিলা। পুরুষ ৪ জন হল:

১. পিতা।

২. স্বামী।

৩. দাদা (দাদার পিতা, তার পিতা এভাবে ঊর্ধ্বতন পুরষ দাদার অন্তর্ভুক্ত)।

৪. বৈপিত্রেয় ভাই।

আর নারী ৮ জন হল:

১. মা।

২. স্ত্রী।

৩. আপন কন্যা।

৪. পুত্রের কন্যা (পুত্রের পুত্রের কন্যা- এভাবে পুরুষযোগে অধস্তন সকল মেয়েই পুত্রের কন্যার অন্তর্ভুক্ত)।

৫. আপন বোন।

৬. বৈমাত্রেয় বোন।

৭. বৈপিত্রেয় বোন।

৮. দাদী ও নানী (পিতার মা, পিতামহের মা- এভাবে পুরুষযোগে ঊর্ধ্বতন সকল দাদী এবং মাতার মা, মাতার নানী- এভাবে নারীযোগে ঊর্ধ্বতন সকল নানী যথাক্রমে দাদী এবং নানীর অন্তর্ভুক্ত) ।

 

উত্তরাধিকার সম্পত্তির নির্ধারিত অংশঃ

পবিত্র কুরআনে أَصْحَابُ الفُرُوْض (নির্ধারিত হকদার) এর প্রত্যেকের সম্পত্তির পরিমাণ এবং কোন অবস্থায় কতটুকু পাবে তা আলোচনা করা হলো:

১। স্বামীঃ স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামীর দুইটি অবস্থা হতে পারে:

(ক) যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে তার কোন ঔরষজাত সন্তান না থাকে তাহলে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবেন।

(খ) আর যদি ঔরষজাত কোন সন্তান থাকে তাহলে ১/৪ অংশ (এক চতুর্থাংশ) পাবেন।

৪। পিতাঃ সন্তান মারা গেলে পিতার তিন অবস্থার যে কোন একটিতে সম্পদ পাবেন:

(ক) যদি মৃত সন্তানের কোন পুত্র (আপন পুত্র বা পুত্রের পুত্র- এভাবে অধস্তন কোন পুরুষ) থাকে তাহলে পিতা সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবেন।

(খ) যদি মৃত সন্তানের কোন পুত্র (আপন পুত্র বা পুত্রের পুত্র- এভাবে অধস্তন কোন পুরুষ) না থাকে কিন্তু তার কোন কন্যা (আপন কন্যা বা কন্যার কন্যা- এভাবে অধস্তন কোন নারী) থাকে তাহলে পিতা أَصْحَابُ الفُرُوْض হিসেবে ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে এবং العَصَبَة হিসেবে অবশিষ্ট অংশ পাবেন।

(গ) যদি মৃত ব্যক্তির কোন সন্তানই না থাকে (চাই তা যত অধস্তনই হোক না কেন) তাহলে পিতা শুধুমাত্র العَصَبَة হিসেবে অবশিষ্ট সকল অংশ পাবেন।

৩। দাদাঃদাদা দ্বারা উদ্দেশ্য হল পিতার বাবা, পিতামহের বাবা, প্রপিতামহের বাবা এভাবে পুরুষযোগে ঊর্ধ্বতন সকলেই দাদার হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। যদি মৃত ব্যক্তির পিতা জীবিত থাকে তাহলে দাদা বঞ্চিত হবে। তবে মৃত ব্যক্তির পিতা যদি জীবিত না থাকে তাহলেই শুধুমাত্র দাদা মিরাসের সম্পত্তি পাবে। আর দাদার মিরাসের সম্পত্তির ক্ষেত্রে পিতার ন্যায়। অর্থাৎ পিতা যে অবস্থায় যতটুকু পেয়েছে দাদা সে অবস্থায় ততটুকু পাবে। সুতরাং পিতার অনুপস্থিতে দাদা হকদার হবেন।

৪। বৈপিত্রেয় ভাইঃ বেপিত্রেয় ভাই দ্বারা উদ্দেশ্য হল মৃত ব্যক্তির মায়ের গর্ভজাত ভাই কিন্তু পিতা ভিন্ন। বৈপিত্রেয় ভাইয়ের তিন অবস্থা রয়েছে:

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনী বা অধস্তন কেউ কিংবা পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ বা ঊর্ধতন কোন পুরষ না থাকে এবং শুধুমাত্র একজন বৈপিত্রেয় ভাই থাকে তাহলে সে সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

(খ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একাধিক বৈপিত্রেয় ভাই থাকে তাহলে সবাই মিলে সম্পত্তির ১/৩ অংশ (এক তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) আর যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনী বা অধস্তন কেউ কিংবা পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ বা ঊর্ধতন কেউ জীবিত থাকে তাহলে বৈপিত্রেয় ভাইয়েরা বঞ্চিত হবে।

৫। মাতাঃ সন্তান মারা গেলে মায়ের তিন অবস্থা হতে একটি অংশ পাবেন:

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির কোন সন্তান থাকে কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকে তাহলে মা সমুদয় সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবেন।

(খ) যদি মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রীর সাথে পিতা মাতা উভয়ে থাকে তাহলে সম্পত্তি থেকে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর মা বাকি সম্পত্তির ১/৩ অংশ (এক তৃতীয়াংশ) পবেন।

(গ) যদি মৃত ব্যক্তির কোন সন্তান না থাকে বা ভাইবোন ২ জনের কম থাকে এবং স্ত্রী কিংবা স্বামী জীবিত না থাকে তাহলে মা সমুদয় সম্পত্তির ১/৩ অংশ (এক তৃতীয়াংশ) পাবেন।

৬। স্ত্রীঃ স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর দুই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়:

(ক) যদি মৃত স্বামীর কোন সন্তান না থাকে তাহলে ১/৪ অংশ (এক চতুর্থাংশ) পাবেন।

(খ) আর যদি কোন সন্তান থাকে তাহলে ১/৮ অংশ (এক অষ্টমাংশ) পাবেন।

উল্লেখ্য যে, একাধিক স্ত্রী জীবিত থাকলেও সবাই মিলে এক স্ত্রীর প্রাপ্র অংশ পাবেন এবং এক স্ত্রীর প্রপ্য অংশ সবাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিবেন।

৭। কন্যাঃ বাবার মৃত্যুর পর কন্যার তিন অবস্থার যে কোন একটিতে সম্পদ পায়:

(ক) যদি শুধুমাত্র একজন কন্যা থাকে এবং কোন পুত্র না থাকে তাহলে সে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।

(খ) আর কন্যা যদি একাধিক থাকে এবং কোন পুত্র না থাকে তাহলে সবাই ২/৩ অংশ (দুই তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) আর যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র এবং কন্যা একসাথে থাকে তাহলে পুত্র-কন্যা ২:১ অনুপাতে পাবে।

৮। পৌত্রীগণঃ পুত্রের কন্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হল আপন পুত্রের কন্যা, পৌত্রের কন্যা, প্রপৌত্রের কন্যা এভাবে অধস্তন সকল পুত্রের কন্যা। তারা একে অপরের অবর্তমানে দাদার সম্পত্তি থেকে মিরাস লাভ করবে। এদের মিরাস পাওয়ার জন্য শর্ত হল মৃত ব্যক্তির কোন পুত্র কিংবা একাধিক কন্যা জীবিত না থাকা। পুত্রের কন্যাদের ছয়টি অবস্থা রয়েছে:

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির কোন পুত্র-কন্যা না থাকে এবং শুধুমাত্র একজন পৌত্রী থাকে তাহলে সে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।

(খ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একাধিক পৌত্রী থাকে তাহলে সবাই মিলে সম্পত্তির ২/৩ অংশ (দুই তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কোন পৌত্র থাকে এবং সাথে এক বা একাধিক পৌত্রী থাকে তাহলে পৌত্রীগণ আসাবা হয়ে যাবে এবং আসহাবুল ফুরুযকে তাদের অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা পৌত্র এবং পৌত্রীগণ ১:২ অনুপাতে পাবে।

(ঘ) যদি মৃত্যু ব্যক্তির কোন পুত্র না থাকে কিন্তু একজন মাত্র কন্যা থাকে এবং সাথে এক বা একাধিক পৌত্রী থাকে তাহলে পৌত্রীগণ সবাই মিলে সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

(ঙ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একাধিক কন্যা থাকে তাহলে পৌত্রীগণ বঞ্ছিত হবে।

(চ) আর যদি মৃত্যু ব্যক্তির কোন পুত্র থাকে তাহলেও পৌত্রীণন বঞ্ছিত হবে।

৯। আপন বোনঃ আপন বোনের পাঁচ অবস্থার মধ্যে যে শর্তটি প্রযোজ্য সেটি অনুসারে সম্পদ পায়:

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা, পিতা-ভাই কেউ জীবিত না থাকে এবং আপন বোন শুধুমাত্র একজন থাকে তাহলে বোন আসহাবুল ফুরুয হিসেবে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।

(খ) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা, পিতা-ভাই কেউ জীবিত না থাকে এবং আপন বোন একের অধিক থাকে তাহলে তারা সবাই মিলে সম্পত্তির   থাকলে ২/৩ অংশ (দুই তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা এবং পিতা জীবিত না থাকে এবং আপন বোনের সাথে আপন ভাই জীবিত থাকে তাহলে বোনেরা ভাইয়ের কারণে আসাবা হয়ে যাবে। তখন আসহাবুল ফুরুযের অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট অংশ আসবা হিসেবে ভাই-বোন ২:১ অনুপাতে পাবে।

(ঘ) যদি মৃত্যু ব্যক্তির আপন ভাই না থাকে কিন্তু একজন মাত্র কন্যা থাকে তাহলে আপন বোনেরা ১/৬ অংশ পাবেন। আর একাধিক কন্যা থাকলে এবং অন্য কোন ওয়ারিশ না থাকলে আপন কন্যাকে দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে বোনেরা তা আসাবা হিসেবে পাবে।

(ঙ) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র কিংবা পিতা কেউ জীবিত থাকে তাহলে আপন বোনেরা বঞ্ছিত হবে।

১০। বৈপিত্রেয় বোন। বৈপিত্রেয় বোন বলতে এমন বোনকে বোঝায় যা মৃত ব্যক্তির সহাদোরা অর্থাৎ একই মায়ের সন্তান কিন্তু বাবা ভিন্ন। বৈপিত্রেয় বোন মিরাসের সম্পত্তি লাভের জন্য শর্ত হল মৃত ব্যক্তির পুত্র, পুত্রের পুত্র কিংবা কন্যা, কন্যার কন্যা- এভাবে অধস্তন কেউ কিংবা পিতা, দাদা এভাবে ঊর্ধ্বতন কেউ জীবিত না থাকা। বৈপিত্রেয় বোনের তিন অবস্থা রয়েছে:

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা কিংবা অধস্তন কেউ অথবা পিতা-দাদা উর্ধ্বতন কেউ না থাকে আর বৈপিত্রেয় বোন শুধুমাত্র একজন থাকে তাহলে সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

(খ) আর উল্লেখিত অবস্থায় যদি বৈপিত্রেয় বোন একাধিক থাকলে তাহলে সবাই মিলে সম্পত্তির ১/৩ অংশ (এক তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) যদি মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা বা অধস্তন কেউ এবং পিতা-দাদা বা উর্ধ্বতন কেউ জীবিত থাকে তাহলে বৈপিত্রেয় বোনেরা বঞ্ছিত হবে।

১১। বৈমাত্রেয় বোনঃ বৈমাত্রেয় বোন বলা হয় যাদের বাবা এক কিন্তু মা ভিন্ন। বৈমাত্রে বোনের সাত অবস্থা হতে যে শর্ত প্রযোজ্য সেই অনুসারে অংশ পাবেন:

(ক) যদি মৃত্যু ব্যক্তির পুত্র, পুত্রের পুত্র বা অধস্তন কেউ, পিতা, দাদা বা ঊর্ধতন কেউ, আপন ভাই, একাধিক আপন বোন কিংবা একজন আপন বোন; সাথে কন্যা, কন্যার কন্যা বা অধস্তন কেউ যদি জীবিত না থাকে আর বৈমাত্রিয় বোন শুধুমাত্র একজন থাকে তাহলে সে আসহাবুল ফুরুয হিসেবে সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।

(খ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় বৈমাত্রেয় বোন একাধিক থাকে তাহলে তারা সবাই মিলে সম্পত্তির ২/৩ অংশ (দুই তৃতীয়াংশ) পাবে।

(গ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একজন মাত্র আপন বোন থাকে তাহলে বৈমাত্রেয় বোন ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

(ঘ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একাধিক আপন বোন থাকে তাহলে বৈমাত্রেয় বোনেরা বঞ্ছিত হবে।

(ঙ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির একাধিক আপন বোন থাকে এবং বৈমাত্রেয় বোনের সাথে বৈমাত্রেয় ভাইও থাকে তাহলে ভাইয়ের কারণে বোনেরা আসাবা হয়ে যাবে। তখন আসহাবুল ফুরুযের অংশ বণ্টনের পর অবশিষ্ট যা থাকবে তা বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ২:১ অনুপাতে পাবে।

(চ) যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কোন কন্যা, কন্যার কন্যা বা অধস্তন কেউ থাকে এবং আপন বোন না থাকে তাহলে বৈমাত্রিয় বোন আসাবা হয়ে যাবে। তখন আসহাবুল ফুরুযকে দেয়ারপর যা অবশিষ্ট থাকবে তার পুরটাই বৈমাত্রেয় বোন আসাবা হিসেবে পাবে।

(ছ) আর যদি উল্লেখিত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কোন পুরুষ ওয়ারিশ জীবিত থাকে তাহলে বৈমাত্রিয় বোনেরা বঞ্ছিত হবে।

১২। দাদী বা নানীঃ দাদী দ্বারা উদ্দেশ্য হল পিতার মা, পিতামহের মা, পিতা মহীর মা, প্রপিতামহের মা, প্রপিতামহীর মা এভাবে ঊর্ধতন সকলেই দাদীর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে নানী দ্বারা উদ্দেশ্য মায়ের মা, নানীর মা, নানীর নানী এভাবে ঊর্ধ্বতন সকলেই নানীর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। দাদী ও নানীর তিন অবস্থা রয়েছে:

(ক)  যদি মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা, দাদা বা ঊর্ধ্বতন কেউ যদি জীবিত না থাকে তাহলে দাদী এবং নানী উভয়ে সম্পত্তির ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

(ক) যদি মৃত ব্যক্তির মা জীবিত থাকে তাহলে দাদী এবং নানী উভয়ে বঞ্চিত হবে।

(খ) আর যদি মৃত ব্যক্তির পিতা জীবিত থাকে তাহলে দাদী বঞ্চিত হবে কিন্তু নানী যথারীতি ১/৬ অংশ (এক ষষ্ঠাংশ) পাবে।

দিতীয় শ্রেণি: العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী।

মৃত ব্যক্তির এমন আত্মীয়-স্বজন যাদের কোন অংশ শরীয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট করা হয় নি। তবে أَصْحَابُ الفُرُوْض তাদের নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে কিংবা أصحاب الفروض এর অবর্তমানে তাদের সমুদয় সম্পত্তির যারা মালিক হয় তাদেরকে العَصَبَة বা অবশিষ্টভোগী বলা হয়। আসাবাদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টনের পদ্ধতি হল الأقرب فالأقرب অর্থাৎ প্রথমে মৃতের নিকটাত্মীয়রা পাবে। এরপর অবশিষ্ট থাকলে দূরের আত্মীয়রা পাবে।

তৃতীয় শ্রেণি: أولو الأرحام বা মৃতের অন্যান্য আত্মীয়স্বজন।

মৃতব্যক্তির যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন أَصْحَابُ الفُرُوْض কিংবা العَصَبَة হিসেবে মিরাস পায় না; বরং এই দুই শ্রেণীর কেউ যদি জীবিত না থাকে তখন যারা মিরাসের সম্পত্তি পায় তাদেরকে أوْلُوْ الأَرْحَام বলা হয়।

 

উত্তরাধিকার বা সম্পদ বন্টনের গানিতিক সমস্যা সমাধান

 

মুসলিম উত্তরাধিকার হিসেব (অংক) অনেক জটিল হতে পারে তবে সাধারণত প্রকটিক্যাল্যি তা হয় না, বোঝার সার্থে আমার একটি সাধারন হিসেব করি।

 

সমস্যা:

 

মনেকরি, ‘রপিক’ একজন মুসিলিম পুরুষ ১০০০০০ টাকার সম্পত্তি রেখে মারা গেল। মৃত্যুর পুর্বে তিনি একজনকে ৫০০০০ টাকা দান করেছেন (কিন্তু সেটা তার হাতে তুলে দিতে পারেন নি) তার এক আত্বীয়কে ৫০০০০ টাকা উইল করেছেন। এবং তার স্ত্রীর দেন মোহর (১ লক্ষ টাকা) পরিশোধ না করেই তিনি মারা যান। অপরদিকে তার মৃত্যুর পর তার সৎকার কর্মে  তার পরিবার ৫০০০০ টাকা খরচ করেন।

 

‘রপিক’ তার ১ স্ত্রী, ১ পুত্র, ২ কন্যা রেখে মারা যান। এদের মধ্যে কিভাবে সম্পত্তি বন্টন হবে?

 

সমাধান:

 

১. প্রথমে সব দেনা পাওনা/ উইল / দান এবং সৎকার খরচ বাদ দিতে হবে

 

 

 

অতএব মোট সম্পত্তি থেকে বাদ গিয়ে থাকে,

১০০০০০০ – ( ৫০০০০ + ৫০০০০ +৫০০০০ + ১০০০০০)

= ১০০০০০০ – ২৫০০০০

= ৭৫০০০০ টাকা

 

২. এবার যেই টাকাটা থাকে তা প্রথমে প্রথম শ্রেণির ওয়ারিশদের মধ্যে অংশ হরে ভাগ হবে। এখানে একমাত্র শেয়ারার অংশীদার হচ্ছে স্ত্রী। তাই প্রথমে তার অংশ বাদ দিয়ে অন্যান্য ওয়ারিশদের মাঝে বন্টন করতে হবে।

 

স্ত্রীর অংশ:

স্ত্রীর অবস্থা দুইটি । যথা- ১/৪ অংশ ও ১/৮ অংশ। যেহেতু মৃতের সন্তান রয়েছে । তাই স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ; বা ৭৫০০০০ এর ১/৮ অংশ = ৯৩৭৫০ টাক।

 

পুত্র ও কণ্যার অংশ:

 

এখানে ১ পুত্র এবং ২ কন্য; সুত্র মতে পুত্রের অর্ধেক পাবে বোন। অতএব, বলা যায়। পুত্র: কন্যা = ২: ১।

 

এখানে যেহেতু, ১ পুত্র = ২*১ = ২ এবং;

দুই কন্যা =  ১*২ = ২

 

তাহলে মোট ভাগ দাড়ায়, ২+ ২ = ৪, তাই বাকি সম্পত্তি (৭৫০০০০ – ৯৩৭৫০ = ৬৫৬২৫০) ৬৫৬২৫০ টিকে প্রথমে ৪ ভাগ করতে হবে, যা করলে দাড়ায় ১৬৪০৬২.৫ টাকা। এই ৪ ভাগের দুই ভাগে পাবেন ভাই (১৬৪০৬৫.২ *২ = ৩২৮১২৫) ৩২৮১২৫ টাকা পাবেন পুত্র / ভাই আর দুই বোন পাবেন এক ভাগ করে যাথাক্রম, প্রথম বোন,  ১৬৪০৬৫.২  এবং দ্বিতীয় বোন,  ১৬৪০৬৫.২।

 

উত্তরাধিকার সম্পত্তির অনেক জটিল হিসাবও হতে পারে । উত্তরাধিকার.বাংলা ক্যালকুলেটর থেকে সহজেই যে কোন সম্পদ বন্টন করে নিতে পারেন।

আরো পড়তে পারেন-

ইন্টারনেটের মাধ্যমে জমির মালিকানা যাচাই এবং জমির খতিয়ান/পর্চা বের করার নিয়ম পদ্ধতি

দলিল কত প্রকার? দলিলের সংজ্ঞা ও রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন

ভূমি জরিপ ও খতিয়ানের প্রকাভেদ বা খতিয়ান কত প্রকার?

মতিউর রহমান

শিক্ষার্থী, ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *